অন্তরালের মুজিব : দুর্ভিক্ষ ও রাজনীতি
যে কথাগুলো লিখবো, সেগুলো আমার মস্তিষ্কউস্প্রুত নয়, উপমহাদেশীয় রাজনীতির ইতিহাসের পাতা থেকে নেওয়া । স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । লাখে লাখে মানুষ গ্রাম ছেড়ে খাবারের সন্ধানে রাজধানী ঢাকার দিকে ধেয়ে এসেছিলো । মুজিব সরকারের উদ্যোগে এই ক্ষুধার্ত মানুষদের জন্য 'লঙ্গরখানা' নামক ক্যাম্প করা হয় । ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকায় ঐ ক্যাম্পকে “মুজিবের লোকদের সৃষ্ট দুর্যোগ এলাকা “ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল ।
১৯৭৪ সালে ১৮ অক্টোবর বোষ্টনের ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরে ডানিয়েল সাদারল্যান্ড লিখলেন : 'খাদ্যাভাবের জন্য গ্রামাঞ্চল ছেড়ে এরা ক্রমেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে সরকার এদেরকে রাজপথের ত্রিসীমানার মধ্যে ঢুকতে না দিতে বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যককে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে সারাদিন দুই এক টুকরা রুটি খেতে পাওয়া যায, মাঝে মাঝে দুই-একটা পিঁয়াজ ও একটু-আধটু দুধ মেলে। ক্যাম্পে ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। “যে দেশে মানুষকে এমন খাঁচাবদ্ধ করে রাখা হয় সেটা কি ধরনের স্বাধীন দেশ”- ক্রোধের সাথে বলল ক্যাম্পবাসীদেরই একজন।' পাঠক অনুধাবন করার চেষ্টা করুন সেইদিনের বুভুক্ষু মানুষের যন্ত্রণার কথা !
গার্ডিয়ান পত্রিকার এক সাংবাদিক ক্যাম্পের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গেলে এক হতভাগ্য ছিন্নমূল ক্যাম্পবাসী বুড়ো বলেছিল , “আমাদের খাইতে দেন, আর না হয় গুলি কইরা মারেন “ ! ১৯৭৪ সালে ২রা অক্টোবর প্রকাশিত লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় জেকুইস লেসলী : “দুর্ভিক্ষ বন্যার ফল ততটা নয়,যতটা মজুতদারী চোরাচালানের ফল”-বললেন স্থানীয় একজন অর্থনীতিবিদ।.. প্রতি বছর যে চাউল চোরাচালন হয়ে (ভারতে) যায় তার পরিমাণ ১০ লাখ টন।”
পাঠক, কি চোরাচালান হতো ? কোথায় যেত বাংলাদেশ থেকে ? মুক্তিযুদ্ধের এক নায়ক মেজর মো: রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম তার বই “শাসনের ১৩৩৮ রজনী” লিখেছেন : “দীর্ঘ ৩ টি বছর আমরা এমনটি প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের চোখের সামনে চাল-পাট পাচার হয়ে গেছে সীমান্তের ওপারে, আর বাংলার অসহায় মানুষ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে।” আবুল মনসুর আহমদ তার লেখা 'আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর' বইতে লিখেছেন : “সীমান্তের ১০ মাইল এলাকা ট্রেডের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হলো। এর ফলে ভারতের সাথে চোরাচালানের মুক্ত এলাকা গড়ে উঠে। পাচার হয়ে যায় দেশের সম্পদ।”
এবারে আসি শেখ মুজিবের রাজনীতির অন্দরমহলে । মুজিব জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেনা, স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ অন্ধের মত বিশ্বাস করতো, এবং এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই বিশ্বাস করে । জাসদ শেখ মুজিবকে স্বৈরাচারী মানত, কারণ ১৯৭২-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি স্বৈরাচারী মনোভাব পোষণ করেছিল । আজকের মন্ত্রী ইনু, সেদিনের জাসদ, কৃষক, কৃষিকর্মী, মজুর ও সাধারণ জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে “গণ-আন্দোলনে” উদ্বুদ্ধ করেছিল। শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের সরকার সেসময় সব বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধ ও জনগণের অধিকার হরণ করেছিল বলে ইনু স্পষ্ট উল্লেখও করেছিল । ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে শেখ মুজিবের রক্ষী বাহিনী জাসদ নেতা-কর্মীদের অমানবিকভাবে হত্যা করার নেশায় মেতে উঠেছিল । জাসদের একটা গ্রুপের সাথে গোপন সম্পর্ক ছিল শেখ মুজিবের । জাসদের সিদ্ধান্ত ছিল ১৯৭৫, ১৭ই মার্চ তারা জনসভা করবে পল্টনে । ইনফর্মারের সাহায্যে শেখ মুজিব বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবনের দিকে লেলিয়ে দেয় । রক্ষী বাহিনী গুলি চালালো আর ১১ জন বিক্ষভ কারী নিহত হল ।
দিনটা ছিল শেখ মুজিবের ৫৩ তম জন্মদিন । হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মুজিব ১১ জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর দিনে ৫৩ পাউন্ডের কেক কেটে জন্মদিন উজ্জাপন করেছিল...............................!


0 comments:
Post a Comment