স্বাধীনতা সংগ্রামের নেপথ্যে কাহিনী (প্রসঙ্গ কথা)
মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আজও রচিত হয়নি। কাজটিও সহজ নয়। এক্ষেএে বিন্দুমাত্র অবদান রাখাও গর্বের বলে মনে করি। মুক্তিযুদ্ধের অনেক কথাই অপ্রকাশিত রয়েছে। দেশের মানুষ হিসেবে এগুলো আমাদের জানা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে পটভূমি হিসেবে ১৯০৫ সাল থেকে বাংলার বিশেষ ঘটনাবলী ধারা বিবরনীর মত সংক্ষেপে বর্ণনা করেছি।
জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন স্বাধীন বাংলার অন্যতম স্হাপতি এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁর কাছ থেকে সে সব ঘটনার কথা শুনেছি।
তাজউদ্দিন আহমেদর ভূমিকার মূল্যায়ন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লেখা সম্বব নয়। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলার সকল স্তরের মানুষের মরণপণ সংগ্রামে দেশ স্বাধীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অস্পষ্ট স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা উওরকালের ইতিহাস বড়ই করুন।
তাজউদ্দিন একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা সংগ্রাম করলাম, তা নিস্ফল হল। মুজিবনগর থেকে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তা স্বাধীন বাংলা ব্যাপক হল। মুজিব ভাই ষড়যন্ত্রকারীদের জালে আটকা পড়লেন। মুজিবনগরের ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলার দুঃখময় জীবনের জন্য দায়ী। আওয়ামী লীগ প্রশাসনের ব্যর্থতা সম্পর্কে তাজউদ্দিন দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছেন, মুষ্টিময়ে কয়েকজন যুবনেতা দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিল।
কলকাতায় মুজিব বাহিনীর সৃষ্টি না হলে স্বাধীন বাংলায় যুবলীগের জন্ম হত না। আর যুবলীগের জন্ম না হলে কিছুতেই শেখ মুজিব তাঁর এককালের ঘনিষ্ঠ সহচর অকৃত্রিম বন্ধু তাজউদ্দিনকে পরিত্যাগ করতেন না এবং পরিণতিতে বাংলাদেশে এই ভয়াবহ পরিস্তিতির উদ্ভব হত না, বঙ্গবন্ধুকেও প্রাণ দিতে হত না এবং কেন্দ্রীয় কারাগারে স্বাধীনতা যুদ্ধের একনিষ্ঠ সৈনিক তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে হত্যা করার দুঃসাহসও কারো হত না।
বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মুত্যুর পর খন্দার মোশতাক আহমদ বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাজউদ্দিনকে কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রাখেন। ১৯৭৫ সালের ২রা নভেম্বর রীট পিটিশনের খসড়া নিয়ে তাজউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করি। তিনি অনুযোগ করলেন ---- আমার জন্য রীট পিটিশন দায়ের করতে এত দেরি হচ্ছে কেন? বদরুদ্দীন সাহেব, মুজিব ভাইকে যারা হত্যা করেছে, আমাকেও তারা বাঁচাতে দেবে না। তবে দুঃখ নেই, আমি আমার ডায়েরি শেষ করেছি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হবে এই ডায়েরি। এই ডায়েরিতেই বিশ্লেষিত হয়েছে মুজিব প্রশাসনের ব্যর্থতা।
এর পরবর্তী রাতেই তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে কারাগারের অভ্যন্তরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। তাজউদ্দিনের ডায়েরিটি আর পাওয়া হয়নি। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের কোন ইতিহাস রেখে যেতে পারেননি।


0 comments:
Post a Comment