Wednesday, December 7, 2016

অচেনা গল্প
December 07, 2016

অচেনা গল্প

এই মুহুর্তে আমি বসে আছি বিশিষ্ট
কার্ডিওলজিস্ট ডা.আবরার রহমানের
চেম্বারে। প্রায় ঘন্টাখানেক হলো আমি
এখানে এসেছি। কিন্তু যে কারনে এসেছি
তা এখনো করা হচ্ছে না। 
দুলাভাই পাঠিয়েছেন আমাকে। আবরার সাহেবকে
একটা চিঠি দিতে। আমি এসে খুবই আন্তরিক
ভঙ্গিতে রিসিপশনিস্ট এর কাছে গিয়ে
দাঁড়ালাম। তিনি সপ্তাশ্চর্যের মত সপ্ত
বিরক্তি মুখে ফুটিয়ে বললেন, "এখানে ভিড়
করবেন না। সিরিয়াল অনুযায়ী ডাকা হবে।
আপনার সিরিয়াল কত?" "আমার তো সিরিয়াল
নেই"। "তাহলে যান চুপ করে বসে থাকেন।
সুযোগ হলে দেখায় দিব"। আমি আর কিছু
বললাম না। বসে গেলাম একটা খালি
চেয়ারে। 
আপাতত কিছু করার নেই। এই রোদে
রাস্তায় হাঁটার চেয়ে ডাক্তার সাহেবের
এসির চেম্বার অনেক আরামদায়ক! আমার ডান
পাশে এক লোক একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে
বসে আছেন। বাচ্চাটা চোখ গোল গোল করে
কিছুক্ষন পর পর আমাকে দেখছে! বাচ্চাটার
দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটা হাসি
দিলাম, যদিও মিষ্টি হাসি আসছে না।
সকালে কিছু খাওয়া হয় নি। হাসি দেখেই
আমাকে ভ্যাংচালো পিচ্চিটা! "ছিঃ বাবু,
জ্বিব বের করে না। তোমাকে উনি পচা
বলবেন"। বাবার মুখে কথাটা শুনে বাচ্চাটা
এবার তার বাবার দিকে তাকিয়ে জ্বিব
বের করল! বাচ্চার বাবা হতাশ গলায় বললেন,
"যারে ওর পছন্দ হয় তারেই ভ্যাংচায়।
আমাকেও খুব পছন্দ করে। তাই ভ্যাংচালো।
কিছু মনে করবেন না ভাই"। আমি আর কিছু না
বলে হাসলাম।"আপনার সমস্যা কি? বুকে
ব্যথা? আফসোস, আপনার মত ইয়াং ছেলেদের
ও এখন হার্টের সমস্যা হচ্ছে", বুঝলাম
ভদ্রলোকের অতিরিক্ত কথা বলার অভ্যাস
আছে। মনে হচ্ছে উঠতে হবে এখান থেকে।
ঘন্টাখানেক পর যখন দুলাভাইয়ের ফোনের
কল্যানে কাজটা শেষ করে বের হলাম তখন
মধ্য দুপুর। পকেট ফাঁকা। সুতরাং বাসায়
ফিরতে হলে হাঁটা ছাড়া কোন উপায় নেই।
দুলাভাই আর আপা ইদানিং আমাকে সহ্য
করতে পারছেন না । আগেও পারতেন না, তবে
ইদানিং একদম ই না। আজ যখন দুলাভাইকে
বললাম , টাকা নেই,তখন তিনি এমনভাবে
তাকালেন যেন আমি একটা এলিয়েন! সুতরাং
আর কিছু বলা হল না।
"এই রোদের মধ্যে হেঁটে কোথায় যাচ্ছ?", পাশ
থেকে কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। রিকশায়
বসা মেয়েটাকে চিনতে কিছুক্ষ লাগল। ওহ,
আমাদের ক্লাশের নিহার। "বাসায় যাচ্ছি"।
এই মেয়েটাকে আমি পছন্দ করতে পারি না।
খুব বড়লোকের মেয়ে। সবার প্রতিই যেন তার
অতিরক্ত আগ্রহ। আর কথাও বলে কেমন ঢং
করে। "কি ব্যাপার। আমাকে দেখে চোখ-মুখ
এমন শক্ত হয়ে গেল কেন! " "কই না তো! রোদে
হাঁটছি তো। তাই বোধ হয়। তোমার গাড়ি
কোথায়? "। "গাড়ি বাদ আজ। কি সুন্দর ঝকঝকে
দিন! তাই রিকশায় বের হলাম"। মনে মনে
ভাবলাম ঢং কত! আমার মত হাঁটো কিছুক্ষন
রোদে, ঝকঝকে দিন নাকি অন্ধকার দিন তা
বুঝবা! রিকশাওয়ালা বিরক্ত মুখে তাকচ্ছে
আমাদের দিকে। নিহার হঠাৎ করে রিকশা
থেকে নেমে বলল, চল তোমার সাথে কিছুক্ষন
হাঁটি! আমি হতভম্ব! বলে কি এই মেয়ে। কঠিন
কিছু কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল।
সামলে নিলাম
নিজে্কে। পাশাপাশি হাঁটছি দুজন। "বাসায়
একটু পরে গেলে হয় না?"। অবাক হয়ে বললাম,
"কেন? "তোমার সাথে হাঁটতে ভালো
লাগছে"। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। "কোথায়
হাঁটবে?"। "কেন ,এভাবে রাস্তায়"। আবারো
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আজ ভালো যন্ত্রনায়
পড়েছি! "কফি খাবো, আসো ওই
রেস্টুরেন্টটায় ঢুকি"। আতংকে আমার হাত পা
জমে গেল! পকেটে তো একটা পয়সাও নেই!
কিন্তু কিছু বুঝার আগেই দেখলাম আমি
নিহার এর পেছন পেছন রেস্টুরেন্ট এর
ভেতরে! টেবিলে বসেই কোন কথা ছাড়াই
এর গাদা খাবারের অর্ডার দিল নিহার। "তুমি
না বললে কফি খাবে? এত খাবার কেন? "।
"তোমাকে দেখে মনে হল তুমি সকাল থেকে
কিছুই খাও নি", অন্যদিকে তাকিয়ে বলল
নীহার। এবার আর নিজেকে সামলাতে
পারলাম না। "তাতে তোমার কি? তুমি আমার
তেমন কোন ক্লোজ ফ্রেন্ড ও না। এসবের
মানে কি?" ।,কথাগুলো বলে নিজেই লজ্জা
পেয়ে গেলাম। একটা মেয়ের সাথে এমন
ব্যবহার করা ঠিক না। অনেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে
তাকাচ্ছে আমার দিকে। নীহার মাথা নিচু
করে বসে আছে। "আমি জানি তুমি আমাকে
খুব একটা পছন্দ কর না। কিন্তু তুমি কি জান
আমি তোমাকে কতটা পছন্দ করি?"।সরাসরি
আমার দিকে তাকিয়ে আছে নীহার।
"ফার্স্ট
ইয়ারে থাকার সময় ক্লাশের কয়েকটা ছেলে
আমাকে নিয়ে বেশ আজেবাজে কিছু
রসিকতা করত। তুমি একদিন খুব কঠিন করে
ওদের কিছু কথা বলেছিলে। এরপর আর ওরা এ
ধরনের কথা বলে নি"। "শুধু একারনেই আমাকে
পছন্দ?"। "না, পছন্দের তো কোন নির্দিষ্ট
কারন থাকে না"। আর তেমন কোন কথা হল না।
চুপচাপ খাওয়া শেষ করলাম দুইজন। রিকশায়
উঠে যাবার আগে নীহার বলল, " তুমি বোধহয়
জানো না তোমার চোখ গুলো খুব সুন্দর। অদ্ভুত
একটা বিষন্নতা তোমার চোখে আছে।
মেয়েরা এই ধরনের চোখের ছেলেদের খুব
পছন্দ করে!" । এবার আমি হেসে ফেলাম। "এই
সুন্দর চোখে প্লিজ আমার দিকে এরকম কঠিন
করে তাকিয়ো না!" , নীহার চলে গেল।
আরেকদিন মধ্য দুপুরে ভার্সিটির করিডোরে
দাঁড়িয়েই বলেছিলাম নীহার কে, "আমার
জন্য প্লিজ তুমি অপেক্ষা কর না।" হাসতে
হাসতেই বলেছিল নীহার, "আচ্ছা করব না!
কিন্তু একটু নরম চোখে তাকাও আমার দিকে"।
আমি জানতাম নীহারের সাথে আমার কখনো
মিলবে না। আমার মত একটা ছেলের জন্য
নীহার শুধু একটা অসাধারন সুন্দর স্বপ্ন। তাই
নীহারকে বলা হয় নি যে, সেই দুপুরটা আ্মার
সাথে থাকবে সব সময়। স্কলারশীপটা হয়ে
গেল হঠাৎ ই । আমাকে তারচেয়েও বেশি
অবাক করে দিয়ে পুরো বিমান ভাড়াটাই
দুলাভাই জোগাড় করে দিলেন। "কখনোই
সেভাবে তোমার জন্য কিছু করিনি। মানুষ
হিসেবে আমি হয়ত খুব বাজে তোমার কাছে।
ক্ষমা করে দিয়ো"। আমি শুধু চুপ করে রইলাম।
কাল ফ্লাইট। বসে আছি নিজের রুমে। বাইরে
দুপুরের অসহ্য রোদ। খুব অসহায় লাগছে। আমি
জানি আমি পারছি না। ফোনটা তুলে নিয়ে
একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে সাড়া
পাওয়া গেল। " হ্যালো"। "নীহার আমি সেই
দুপুরটার কথা ভুলতে পারছি না। তুমি কি
প্লিজ একবার বের হবে? " । রিকশায় যখন দুজন
পাশাপাশি বসলাম নীহারের গায়ের অদ্ভুত
সুন্দর একটা গন্ধ পাচ্ছিলাম। খুব সঙ্কোচ
হচ্ছিল। তবু ও ধরলাম ওর হাতটা! অচেনা নয় খুব
কাছের একজনের হাত।

0 comments:

Post a Comment